গোল শুধু স্কোরলাইন বদলায়নি, বদলে দিয়েছিল ইতিহাসের গতি। ফিরিয়ে আনে আর্জেন্টিনার বিশ্বাস। আটলান্টার বুধবার রাতে এনজো ফার্নান্দেজের গোলটি ছিল আর্জেন্টিনার নিভে যেতে বসা স্বপ্নের নতুন শ্বাস।
ঘড়িতে তখন ৮৫ মিনিট। ইংল্যান্ড অ্যান্থনি গর্ডনের গোলে এগিয়ে। কয়েক মিনিট পরই শেষ হয়ে যাবে লিওনেল মেসির বিশ্বকাপ অভিযানের স্বপ্ন। গ্যালারির আকাশি-সাদা অংশে নেমে এসেছিল অস্বস্তিকর নীরবতা।
ঠিক তখনই সামনে এলেন এনজো। মেসির কাছ থেকে বল পেয়ে বক্সের বাইরে এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করেননি। ডান পায়ের নিখুঁত, শক্তিশালী শট ছুটে গেল জালের কোণে। ইংল্যান্ডের গোলকিপার শুধু তাকিয়ে রইলেন। মুহূর্তেই বিস্ফোরিত হলো মার্সিডিজ-বেনজ স্টেডিয়াম। আকাশি-সাদা গ্যালারি বিশ্বাস করতে শুরু করল গল্প এখনও শেষ হয়নি।
সেই গোলের পর দুই হাত ছড়িয়ে দৌড়াচ্ছিলেন এনজো। সতীর্থরা তাকে জড়িয়ে ধরছিলেন। গোল এক কিংবদন্তির শেষ বিশ্বকাপ স্বপ্নটিকেও বাঁচিয়ে রেখেছিল।
সাত মিনিট পর সেই গল্প পূর্ণতা পায়। যোগ করা সময়ে লিওনেল মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে লাউতারো মার্তিনেজের হেড। ২-১। আর্জেন্টিনা ফাইনালে। ফিরে আসার প্রথম আগুনটি জ্বালিয়েছিলেন এনজোই।
২০০১ সালের ১৭ জানুয়ারি আর্জেন্টিনার সান মার্টিনে জন্ম এনজো জেরেমিয়াস ফার্নান্দেজের। ছোটবেলা থেকেই ফুটবল ছিল তার পৃথিবী। রিভার প্লেটের একাডেমিতে বেড়ে ওঠা এই ছেলেটি বলের সঙ্গে এমন বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছিলেন, যা পরে তাকে পৌঁছে দেয় বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে।
রিভার প্লেটে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ইউরোপের দরজা খুলে যায় বেনফিকায়। পর্তুগালে মাত্র কয়েক মাস খেলেই তিনি ইউরোপের অন্যতম আলোচিত মিডফিল্ডারে পরিণত হন। রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে যোগ দেন চেলসিতে। মাঝমাঠে তার ফুটবল বুদ্ধিমত্তা অসাধারণ। প্রতিপক্ষের আক্রমণ ভাঙা, খেলা গড়া, দূরপাল্লার পাস, টেম্পো নিয়ন্ত্রনে তিনি সমান দক্ষ। প্রয়োজন হলে নিজেই আক্রমণে উঠে গোলও করেন। আধুনিক ফুটবলে সম্পূর্ণ মিডফিল্ডার বলতে যা বোঝায়, এনজো তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে সেরা উদীয়মান খেলোয়াড়ের পুরস্কার জিতেছিলেন তিনি। প্রমাণ করেছিলেন, বয়স নয়, ব্যক্তিত্বই বড়। চার বছর পরও সেই ব্যক্তিত্ব আরও পরিণত হয়েছে। চলতি বিশ্বকাপেও তিনি আর্জেন্টিনার মাঝমাঠের প্রাণ। প্রতিটি ম্যাচে তার দৌড়, পাস, ট্যাকল দলের ভারসাম্য ধরে রেখেছে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালে সেই দায়িত্বই নতুন মাত্রা পেল ৮৫ মিনিটে নেয়া শটে।
ম্যাচ শেষে এনজো বলেছিলেন, ‘আমরা কখনো বিশ্বাস হারাইনি। শেষ বাঁশি পর্যন্ত লড়াই করি আমরা ,একটি সুযোগই ম্যাচ বদলে দিতে পারে।’
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ হয়তো মনে রাখবে লাউতারো মার্তিনেজের জয়সূচক গোল, মেসির অসাধারণ অ্যাসিস্ট কিংবা আর্জেন্টিনার টানা দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার গল্প। সেই গল্পের প্রথম বাক্যটি লিখেছিলেন এনজো ফার্নান্দেজ।
৮৫ মিনিটে তিনি শুধু বল জালে জড়াননি। তিনি কোটি আর্জেন্টাইনের নিভে যেতে বসা বিশ্বাসে আবার আলো জ্বালিয়েছিলেন। শুধু সমতা ফেরাননি,লিওনেল মেসির শেষ বিশ্বকাপ অভিযানের দরজাটি খোলা রেখেছিলেন। সেই জন্যই আটলান্টার রাতের ইতিহাস যখনই লেখা হবে, সেখানে একটি মুহূর্ত আলাদা আলোয় জ্বলবে ৮৫ মিনিট, এনজো ফার্নান্দেজ, আর এক শট, যা শেষ হওয়ার আগে পুরো গল্পটাই বদলে দিয়েছিল।


